আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে তাহাজ্জুদের উদ্দেশে যখন দাঁড়াতেন, তখন তাকবীরে তাহরীমার পর বলতেন, «اللهم ربَّنا لك الحمدُ» “হে আল্লাহ! আপনারই জন্য সমস্ত প্রশংসা।” অর্থাৎ, সমস্ত প্রশংসার পাওনা ও অধিকারী কেবল আপনি। তিনি তার সিফাতসমূহ, নামসমূহ ও নি‘আমাতসমূহের জন্যে প্রশংসিত এবং আরো প্রশংসিত তার ক্ষমতা, সৃষ্টি, কর্ম, নির্দেশ ও বিধানের জন্যে। তিনি প্রশংসিত শুরুতে ও শেষে এবং প্রকাশ্যে ও গোপনে। তারপর বলেন, «أنت قَيِّمُ السموات والأرض» “আপনি আসমান যমীন ও এ দু’য়ের মাঝে বিদ্যমান সব কিছুর নিয়ামক।” অর্থাৎ আপনিই অস্তিত্বহীন থেকে অস্তিত্ব দান করেছেন। আপনিই এ দুটিকে ঠিক রাখা ও কায়েম রাখার নিয়ামক। আপনিই স্রষ্টা, রিযিকদাতা, অধিপতি, পরিচালক, জীবন-দাতা ও মৃত্যু-দাতা। তারপর তিনি বলেন, «ولك الحمدُ أنت رب السموات والأرض ومن فيهنَّ» “এবং আপনারই জন্য সমস্ত প্রশংসা। আসমান, যমীন এবং তাদের মাঝে বিদ্যমান সবকিছুর কর্তৃত্ব আপনারই।” আপনি দুইয়ের এবং তার মধ্যে যা কিছু আছে সবকিছুর মালিক। আপনার ইচ্ছা অনুযায়ী এ দুইয়ের কর্তৃত্বকারী আপনি নিজেই। আপনি এ দুটিকে অস্তিত্বহীন থেকে অস্তিত্ব দানকারী। সুতরাং, মালিকানা আপনার, আপনার সাথে আর কারো কোনো শরীক বা পরিচালক নেই। আপনি বরকতময় ও মহৎ। তারপর তিনি বলেন, «ولك الحمدُ أنت نورُ السماوات والأرض ومن فيهنَّ» “আপনারই জন্য সমস্ত প্রশংসা। আপনি আসমানসমূহ ও যমীনের এবং তদুভয়ে যা কিছু আছে তার নূর।” আল্লাহর একটি সিফাত হলো তিনি নূর, তিনি নূরের দ্বারা মাখলুকের থেকে আড়াল হয়ে আছেন। তিনিই আসমানসমূহ ও যমীনকে আলোকিতকারী। আসমানসমূহ ও যমীনের অধিবাসীদের পথ পদর্শক। নূরের সিফাতটি আল্লাহর থেকে অস্বীকার করা যাবে না এবং তাতে কোনো ব্যাখ্যা করা যাবে না। তারপর তিনি বলেন, «أنت الحقُّ» “আপনিই চির সত্য।” হক তার নাম ও সিফাতসমূহ থেকে একটি নাম ও সিফাত। তিনি তার সত্বা ও গুনে সত্য। তার অস্তিত্ব ওয়াজিব। সিফাত ও প্রশংসায় তিনি পরিপূর্ণ। তার অস্তিত্ব তার জাতের অপরিহার্য এক বিষয়। তিনি ছাড়া কোনো কিছুর অস্তিত্ব চিন্তা করা যায় না। তারপর তিনি বলেন, «وقولُك الحقُّ» “আপনার বাণী সত্য।” আপনি যা বলেছেন, তা সত্য, হক ও ইনসাফ-পূর্ণ। বাতিল তার সামনে ও পিছনে আসতে পারে না। না পারে তার সংবাদে, হুকুমে এবং শরী‘আতে আসতে এবং না পারে তার প্রতিশ্রুতি ও হুমকিতে আসতে। তারপর তিনি বলেন, «ووعدُك الحقُّ» “আপনার ওয়াদা চির সত্য।” অর্থাৎ আপনি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না। আপনি যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা অবশ্যই সংঘটিত হবে। তাতে কোনো পিছপা বা অমিল থাকবে না। তারপর তিনি বলেন, «ولقاؤك حقُّ» “আপনার সাক্ষাৎ সত্য।” অর্থাৎ বান্দাগণ অবশ্যই আপনার সাক্ষাৎ করবেন। তখন আপনি তাদের আমল অনুযায়ী বিনিময় দান করবেন। আল্লাহর দেখা তার সাক্ষাতের অন্তর্ভুক্ত। তাপর তিনি বলেন, «والجنةُ حقٌّ، والنارُ حقٌّ» “জান্নাত সত্য; জাহান্নাম সত্য।” অর্থাৎ উভয়টি প্রমাণিত ও মওজুদ। যেমন, এ বিষয়ে সংবাদ দেওয়া হয়েছে যে, এ দুটি তাদের অধিবাসীদের জন্য প্রস্তুতকৃত। এ দু’টি হলো স্থায়ী ঘর। বান্দারা ফিরবে এ দু’টি দিকেই। তারপর তিনি বলেন, «والساعةُ حقٌّ» “কিয়ামত সত্য।” অর্থাৎ, কিয়ামতের আগমন সত্য তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তা অবশ্যই সংঘটিত হবে। আর তা হলো দুনিয়ার ইতি ও আখিরাতের শুরু। তার বাণী: «اللهم لك أسلمتُ» “ইয়া আল্লাহ! আপনার নিকটই আমি আত্মসমর্পণ করলাম।” আপনার বিধান অনুগত হলাম, মেনে নিলাম এবং সন্তুষ্ট হলাম। তার বাণী: «وبك آمنت» “আপনার প্রতি ঈমান আনলাম।” অর্থাৎ আপনাকে এবং যা নাযিল করেছেন তা বিশ্বাস করলাম এবং তদুনুযায়ী আমল করলাম। «وعليك توكلت» “আপনার উপরেই তাওয়াককুল করলাম।” অর্থাৎ, আপনার ওপর ভরসা করলাম এবং আমার যাবতীয় বিষয় আপনার প্রতি সোপর্দ করলাম। «وإليك خاصمت» “আপনার সাহায্যে তর্কে লিপ্ত হলাম।” অর্থাৎ আপনি যে সব অকাট্য প্রমাণাদি আমাকে দিয়েছেন তার দ্বারা হঠকারীদের প্রমাণ তুলে ধরলাম এবং বিজয় লাভ করলাম। «وبك حاكمت» “আপনাকেই বিচারক মেনে নিলাম।” অর্থাৎ যতজন সত্য গ্রহণ করতে অস্বীকার করে এবং মেনে নেয় না তাকে আপনার নিকট বিচারের জন্য নিয়ে আসলাম। সকল তাগুত বা গণক ইত্যাদির বানানো বাতিল বিধান যার দিকে মানুষ বিচার নিয়ে যায় তাকে দূরে ফেলে আমার ও তার মাঝে আপনাকে বিচারক বানালাম। তার বাণী: «فاغفر لي ما قدَّمتُ وما أخَّرتُ، وأسررتُ وأعلنتُ، وما أنت أعلم به مني» “তাই আপনি আমার পূর্বাপর ও প্রকাশ্য গোপন সব অপরাধ ক্ষমা করুন। আপনিই অগ্র পশ্চাতের মালিক।” অর্থাৎ যেসব গুনাহ সম্পর্কে আমি জানি এবং যা আমি ভবিষ্যতে করব, এবং যা তোমার কোনো মাখলুকের কাছে প্রকাশ পেয়েছে এবং যা তাদের থেকে গোপন রয়েছে, এবং তুমি ছাড়া আর কেউ জানে না। তারপর তিনি এ বলে দো‘আ শেষ করেন, «لا إلهَ إلا أنت» “আপনি ব্যতীত সত্য প্রকৃত কোন ইলাহ নেই।” সুতরাং আপনি ছাড়া আর কারো দিকে আমরা ঝুঁকবো না, আপনি ছাড়া আর যাকে তারা ইলাহ বানিয়েছে সবই বাতিল। তার দিকে আহ্বান গোমরাহি ও বিপদ। আর এটিই হলো তাওহীদ যা নিয়ে আল্লাহর রাসূলগণের আগমন এবং যা আল্লাহ তার বান্দাদের ওপর ওয়াজিব করেছেন।